শনিবার, মার্চ ২, ২০২৪
spot_img

নারায়ণগঞ্জ বিআইএমটি শিক্ষা ব্যবস্থার কর্মসংস্থানে ভাটা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জ বন্দর উপজেলার সোনাকান্দা বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (বিআইএমটি) স্থাপিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মেরিন ও শিপবিল্ডিং এ কর্মসংস্থান উপযোগী ট্রেড কোর্স চালু করা হয়। যার ফলে বেকার যুবকদের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

আশির দশকে মেরিন ডিপ্লোমা কোর্স এবং ২০১০ সালের দিকে শিপবিল্ডিং ডিপ্লোমা কোর্স চালু করা হয়। উভয় কোর্সের শিক্ষার্থীরা দেশ ও বিদেশে জাহাজে ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করে। তাতে তাদের ভাগ্যের চাকা পরিবর্তন করে। মেরিন টেকনোলজির শিক্ষার্থীরা নৌ পরিবহন অধিদপ্তর থেকে সিডিসি নিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্যিক জাহাজে বড় অংকের বেতনে চাকরি পেত। কিন্তু ২০১০ সালে নৌ পরিবহন অধিদপ্তর সিডিসি প্রদানে নীতিমালা পরিবর্তন করে। সেক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের কারিকুলাম দিয়ে সিডিসি প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। মূলত ২০১০ সালের পর থেকে কোন শিক্ষার্থী সিডিসি নিয়ে আর বিদেশগামী জাহাজে চাকরি নেয়ার সুযোগ পায় নাই। ফলে কর্মসংস্থানের নামে তৈরী হয় প্রতিবন্ধকতা। বিগত এক যুগ ধরে প্রতিষ্ঠানটির সেই সুনাম আর নেই।

ছাত্র ছাত্রী কর্মকর্তা কর্মচারি ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগে প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ খুব ভালোভাবে চলত। এখন আর তেমন প্রশিক্ষণ হয় না। কয়েকজন জুনিয়র ছাত্রছাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা এখানে আসে শুধুমাত্র দিনের বেলায় বড় ভাইদের রান্না বান্না ও কাপড় ধৌত করার জন্য। রাত হলেই চলে প্রতিদিনের মতো রাত তিনটা চারটা পর্যন্ত মিটিং। এসব বিষয়ে হোস্টেল সুপারদের বলতে গেলে তারাও নানা ভয়ভীতি দেখায়। কারণ তারা সিট বাণিজ্যের মাধ্যমে বহিরাগত ও প্রাক্তন ছাত্রদের থাকতে দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করে থাকে। আজাদ স্যার ও শামছুল ইসলাম স্যার এ বিষয়ে কোনো খোজ খবর রাখেন না। হোস্টেল সুপার আজাদ স্যার গান বাজনায় মগ্ন। যদিও তাকে সম্প্রতি বাগেরহাট আইএমটিতে বদলী করা হয়েছে। শামসুল ইসলাম স্যার সপ্তাহে দুই একদিন অফিস করেন। আবার কোন সমস্যার বিষয়ে বললে সেগুলো আমলে নেয় না।

ফায়ার ঘাট এলাকা দিয়ে যাতায়াতরত অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায়, ছাত্ররা দিনরাত রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত থাকে। রাস্তার পাশের বেলকনি হতে সবই দেখা যায়। আর যারা কর্মরত আছেন তাদের বেশিরভাগই সঠিকভাবে অফিস করেন না। অনেকে আবার এই চাকরীর পাশাপাশি অন্য চাকুরী করে থাকেন। অনেকে আবার ঢাকায় থাকেন যারা মাসে দুই একদিন আসেন অফিস করতে। এ যেন এক অনিয়মের কারখানা।

এখানে চলে বিদেশগামীদের তিন দিনের প্রশিক্ষণ ও ফিঙ্গার প্রিন্ট। অনেকেই জড়িয়ে পড়েছেন মারাত্মক অনিয়মের মধ্যে। ফিঙ্গার ও পিডিও প্রশিক্ষণের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কিছু আসাধু কর্মচারী। এছাড়াও অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত এপ্রিল মাসে অত্র প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন প্রকৌ: মাহবুবুর রশীদ তালুকদার। তিনি আগে বিএমইটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। যোগদানের পর হতেই তিনি এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেন। পুরো প্রতিষ্ঠানের হারানো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে এনে হাতে কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন। ভাঙ্গাচোরা লাইব্রেরিকে তিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্মার্ট লাইব্রেরিতে রুপান্তর করেন। লাইব্রেরিতে সংযোজন করেন নতুন বইয়ের এক বিশাল সমাহার। প্রত্যেকটি ল্যাব, ওয়ার্কশপ এবং ক্লাস রুমে ইন্টারনেট সহ স্মার্ট টিভি স্থাপন করেন। আরএসি ল্যাব, প্লাম্বিং ল্যাব, সেফটি ল্যাব, হার্ডওয়্যার ল্যাব, ইলেকট্রনিক্স ল্যাব, মেরিন স্টিম পাওয়ার ও গ্যাস টারবাইনের মতো ছয়টি নতুন ল্যাব স্থাপন করেন। এছাড়াও লাইব্রেরি, ওয়ার্কশপ, নতুন ও পুরাতন একাডেমিক ভবন ছাত্র-ছাত্রী হোস্টেলে ইন্টারনেটের আওতায় আনার যাবতীয় প্রস্তুতি নেন। যার ৮০% কাজ তিনি সম্পাদন করেছেন। সকল ওয়ার্কশপগুলোকে প্রশিক্ষণ উপযোগী আধুনিক মানের করার জন্য অকেজো ইঞ্জিন ও মেশিনগুলোকে সচল করার জন্য এবং আরও নতুন নতুন টেকনোলজির যন্ত্রপাতির স্থাপনের পরিকল্পনা নেন। কিন্তু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারিদের অনৈতিক সুযোগ সুবিধা বাধাগ্রস্থ হওয়ায় তারা বিভিন্নভাবে ছাত্র উস্কানি ও বহিরাগত কিশোর গ্যাং লেলিয়ে দিতে থাকে। বিশেষ করে হোস্টেল সুপার আজাদ সাহেব ও শামছুল ইসলামসহ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী এর পিছনে সিংহভাগ জড়িত। হোস্টেলের ডাইনিং না চালানোর কারণে অত্যাধিক হিটার ব্যবহৃত হয়। যার ফলে মাসিক বিল আসে প্রায় তিন থেকে চার লক্ষ টাকা। অত্যাধিক বিল আসায় বিল নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য হিটার, রাইচ কুকার নিধনের পদক্ষেপ হিসেবে অধ্যক্ষ একটি কমিটি করে। কমিটি সহ তিনি নিজে গত ০৩/০৯/২০২৩ খ্রিঃ তারিখে হোস্টেলে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন অনেক বহিরাগত ও প্রাক্তন ছাত্ররা অবস্থান করছে। ঐ সময়ে প্রায় ৮-১০টি হিটার, রাইছ কুকার,বহিরাগতদের থাকার জন্য অতিরিক্ত জাজিম বেড তোষক পাওয়া যায়। ঐ সময়ে প্রতিবেদন তৈরি করে হোস্টেল সুপার আজাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ছাত্রদের বিভিন্নভাবে উস্কানি দিয়ে উত্তেজিত করেন। ঐ দিনই কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারিকে ছাত্ররা মারধর করে এবং কয়েকজনকে মেরে জখমও করে। এছাড়াও ছাত্ররা বিভিন্ন স্থাপনা ও সরকারি অন্যান্য মূল্যবান সম্পত্তি ব্যাপকভাবে ভাঙচুর করে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যক্ষ তিন সদস্যবিশিষ্ঠ তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সাপেক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কারণ দর্শানো নোটিশ দেন দোষী ছাত্রদের। দোষী সাব্যস্ত যারা ২য় পর্বের মেরিন টেকনোলজি এর ছাত্র মীর তাওহীদুল ইসলাম অভি ৪র্থ পর্বের মেরিন টেকনোলজির ছাত্র মিমরাজুল ইসলাম সানি, শিহাব প্রধান, জেরিন চাকমা এবং শিপবিল্ডিং এর ছাত্র সাব্বির হোসেন, ৬ষ্ট পর্বের মেরিন টেকনোলজির ছাত্র নাজমুল হাসান, খায়রুল হাসান এবং শিপবিল্ডিং টেকনোলজির মোঃ আরিফ।

আরো দেখুন
Advertisment
বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে জনপ্রিয়